এস এম মামুন , যশোর
দেশব্যাপী মফস্বল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সর্বত্র পর্যায়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক দৌরাত্বের প্রভাবে ঘটে চলেছে সামাজিক অবক্ষয়। অন্তবর্তী সরকারের চলমান সময়ে উপজেলা পর্যায়ে জবরদখল,অধিপত্য বিস্তার,হামলা-মামলা,সন্ত্রাসী কর্মকান্ড,ধর্ষন-খুনের পাশাপাশি আজকের এ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মাটি ব্যাবসায়ীদের প্রকাশ্যে আইন অমান্যর চিত্র। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাটি খেগোদের দৌরাত্বের তথ্য সংগ্রহ করেছে মণিরামপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের একটি অনুসন্ধানী টিম। রাজনৈতিক দলের প্রভাব দেখিয়ে প্রকাশ্যে মাটি কাটার তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া ও মাদক দিয়ে ফাসানোর হুমকি দিচ্ছে এ সমস্ত মাটি খেকোরা।
মণিরামপুর পৌরসভার আশপাশ থেকে শুরু করে প্রতি ইউনিয়নে গড় ৪-৫টা পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ সরকারের বলুমহাল ও মাটি ব্যাবস্থা আইন,২০১০-এর ধারা-৫ এর ১ উপধারানুযায়ী পাম্প বা ট্রেটিং বা অন্যকোন মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলনে ধারা-৪এর(খ) অনুযাযী নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে ২ বছরের কারাদন্ড এবং সর্বোচ্ছো ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবে উল্লেখ থাকলেও ভূমি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি ও ব্যাক্তি মালিকানাধীন কৃষি জমি কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে মাটি খেগোরা।সঠিক তদারকি ও আইন প্রয়োগের অভাবে আরো আগ্রাসী হয়ে উঠেছে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু এবং মাটি উত্তোলন সিন্ডিকেট।
জমির মালিকদের ঘের করার পরামর্শ ও নগদ অর্থের লোভ দেখিয়ে মাটি ব্যাবসায়ীরা মাটি কেটে নষ্ট করছে পরিবেশ ও ভৌগোলিক ভারসাম্য হারাচ্ছে জলবায়ু।এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে জমির মালিক মাটি বিক্রি করতে না চাইলেও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।এদের সাথে স্থানীয় ভাটা মালিকেরা আছে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে।উপজেলা প্রশাসনের ছাড়পত্র পেয়ে মাটি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবী করছে বেশিরভাগ মাটি ব্যবসায়ী।
তথ্যমতে উপজেলার রহিতা,খেদাপাড়া,ঝাপা,মশ্বিমনগর,চালুয়াহাটি,হরিহরনগর,শ্যামকুড়,দূ্বাডাংগা,মনোহরপুর,খানপুর,নেহালপুর,কুলটিয়া,হরিদাসকাঠি,ঢাকুরিয়া,ভোজগাতী ও মণিরামপুর সদর ইউনিয়নের পাকা রাস্তা,সলিং রাস্তা,অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাটি বহন কারি ডাম্প ট্রাক,ট্রলি। রাস্তার টেম্পার নষ্ট হচ্ছে,মাটি রাস্তায় পড়ে ধূলাবালি জনসাধারণের ক্ষতি করছে,অতিরিক্ত গাড়ীর চাপে ছোটখাটো রাস্তার পাড় ভেংগে চলাচলের অনুউপযোগী হয়ে পড়েছে,কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।পাড়া মহল্লায় মাটির গাড়ির আনগোনায় কোমলমতী শিশুরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে।এমন সব অভিযোগ করেছে একাধিক ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
সরেজমিনে দেখা যায়,দূর্বাডাংগা,চালুয়াহাটি,খেদাপাড়া,রহিতা,ভোজগাতী,ঢাকুরিয়া,হরিদাসকাঠি ও খানপুর ইউনিয়নে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে মাটি ব্যবসায়ীদের রমরমা ব্যবসা। কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তারা ক্যামেরার সামনে আসতে আসতে নারাজ। স্থানীয় প্রভাব,ভাটা কর্তৃপক্ষের সাথে আঁতাত ও উপজেলা প্রশাসনের গাফিলতির কারনে এমন আগ্রাসী হয়ে উঠেছে মাটি খেগোরা বলে সত্যতা মিলেছে।
অনুসন্ধান বলছে,১৭ ইউনিয়নের মাটিকাটার হিড়িকের মধ্য ব্যাপক আকার ধারন করেছে উপজেলার দূর্বাডাংগা ইউনিয়নে। কৃষি ও বাসযোগ্য জমি গত ডিসেম্বর হতে এ পর্যন্ত মাটি কেটে একাকার করে দিচ্ছে ঐ এলাকার জামীর গাজীর ছেলে শিমুল গাজী ও তার গ্যাং। এমনই অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়,ইউনিয়নের প্রতিটি রাস্তা জুড়ে শিমুল গাজীর মাটিবহনকারী অবৈধ ট্রলির দৌরাত্ম। নতুন পিচের রাস্তা,ইটের সলিংয়ে মাটির প্রলেপ। ইউনিয়নের নওশের মোড়,কুশরীকোনা,শ্যামনগর জুড়ে শিমুলের মাটি কাটার গ্যাং তাদের সিন্ডিকেট আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। ফুটেজ আছে, নওশের মোড় হতে পূর্বে ৫শ মিঃ আসপাশে ২০/২২টি পরিবারের যাতায়ত রাস্তা এখন খানায় পরিনত হয়েছে মাটিবাহী ট্রলীর যাতায়তে। ভিডিও ধারনের একপর্যায়ে মাটি খাদক শিমুল এ প্রতিবেদকের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে বলে,তুমি বলে ছেড়ে দিলাম!আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে,কারা আসছে আমার নাম শুনেও এটা জেনে। এক পর্যায়ে আরেক সাংবাদিক সদস্যকে ফাঁকায় ডেকে বলে,হাত-পা ভেঙে দিতাম অন্য কেউ আসলে! না হলে মাদক আছে তাই দিয়ে মারধর করে প্রশাসনের কাছে তুলে দিতাম! তোমরা আসছো চা খেয়ে চলে যাও।মাটি খাদক শিমুলের আগ্রাসন দেখে খোজ নিয়ে জানা যায় কয়েকমাস আগে এই শিমুল ফেনসিডিল ও বিপুল পরিমান ইয়াবা সহ চিনেটোলা বাজার হতে প্রশাসনের কাছে গ্রেফতার হয়েছিলো। গোপন তথ্য আছে,শিমুল ও তার গ্যাং অত্র এলাকায় সর্বধরনের মাদক সাপ্লাই দেই,তার কাছে সব সময় মাদকদ্রব্য(ইয়াবা,গাঁজা) মজুত থাকে।
বর্তমানে মণিরামপুর উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের চলমান ভূমি আইনের প্রতি অবহেলার ধারাবাহিকতাই উপজেলা প্রশাসন পদক্ষেপের পরিবর্তে আইনের বইয়ের পাতায় রেখে নীরব থাকে তাহলে দ্রুতই জলবায়ু ও পরিবেশ ধীরে ধীরে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে,এমনটাই মন্তব্য করছেন কৃষিবীদ ও সচেতন মহল।
ফসলী জমি থেকে মাটি কাটাতে প্রথমত উপরের স্তরের উর্বর অংশ কেটে নিলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে ফসলী জমি কমে যেয়ে কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের কৃষিতেই বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে জানান,মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ মাহমুদা আক্তার।
এ ক্ষেত্রে সম্প্রতি মণিরামপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি মাহির দায়ান আমিনের কয়েকটি অভিযানের জরিমানায় অনেকটা আশার আলো দেখা গেছে ভুক্তভোগী মহলে। এক সপ্তাহের ব্যাবধানে পরপর ৪টি অভিযানে নগদ জরিমানা করতে দেখা গেছে কয়েকদিনে। তবে তথ্য দিলে তার সত্যতা মিললে স্থানীয় ভূমি নায়েব সহ সংশ্লিষ্ট টিম ২০১০সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করতে তৎপর আছেন বলে জানিয়েছেন মণিরামপুর উপজেলার নবাগত সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন।





