ময়মনসিংহ বিভাগ-মোঃ আমিনূর ইসলাম রাব্বি
ময়মনসিংহের কিংবদন্তি রাজনৈতিক প্রাণপুরুষ সাবেক ধর্মমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান (৮১) আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ২৭ আগস্ট,রোববার,২০২৩, দিবাগত রাত ১০:৪৫ মিনিটে নগরীর ধোপাখোলা নেক্সাস কার্ডিয়াক হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।সাবেক ধর্মমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও সকল শ্রেণিপেশার মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছিলেন। এতে সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। ২৮ আগস্ট ২০২৩ তারিখ বাদ আছর ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠ প্রাঙ্গনে এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের ১ম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবার সূএে জানাজায় যে, ২৯.০৮.২০২৩ রোজ মঙ্গলবার বাদ জোহর/আসর আকুয়া, মরহুম এর নিজ জন্মভূমিতে ২য় জানাযা শেষে পারবারিক কবরস্থানে দাফন কাজ সম্পন্ন করবেন।
মরহুম প্রবীন এই আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য’র, সাবেক ধর্মমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মতিউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা। শত প্রলোভনের মুখে এবং বারবার কারাবরণ করা সত্ত্বেও সারাজীবন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি অবিচল থেকে তিনি তাঁর সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিন দশকের বেশি সময় ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বদানকারী এই নেতা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ও সফল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ২০২২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে দলের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো এবং আমি হারালাম একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে।
প্রধানমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। বর্ষিয়ান এই রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ ও বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ময়মনসিংহ বাসী।
প্রবীণ সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ১৯৪২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ সদরের আকুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুর রেজ্জাক এবং মায়ের নাম মেহেরুন্নেসা খাতুন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ঢালু যুব শিবিরের ইনচার্জ ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ পাক-হানাদার মুক্ত হওয়ার দিনে শহরের সার্কিট হাউজ মাঠে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে একুশে পদক পান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম এ নেতা।সাবেক ধর্মমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও সব শ্রেণিপেশার মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছিলেন। এতে সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা, যারা ছিলেন ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সহযোদ্ধা, এসেছিলেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
আওয়ামী লীগের বটবৃক্ষ শ্রদ্ধাভাজন প্রিয়নেতার জানাযায় কৃষিমন্ত্রী ড.আব্দুর রাজ্জাক এমপি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপি, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবু এমপি, সমাজ কল্যান প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু,এডভোকেট মোসলেম উদ্দিন এমপি, আতিকুর রহমান আতিক এমপি,আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিন এমপি, মসিক মেয়র মোঃ ইকরামুল হক টিটু, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব এহতেশামুল আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল,সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশরাফ হোসাইন,স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবুসহ কেন্দ্রীয় ও এতদাঞ্চলের সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, নির্বাচিত জন প্রতিনিধি, প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা গন, সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিগন জানাজায় অংশ গ্রহণ করেন।
ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। তিনি ২০১৪ সালে ধর্মমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি ময়মনসিংহ সদর আসন থেকে ১৯৮৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের সংসদ সদস্য হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অকৃত্রিম অবদানের জন্য অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ‘মুজিব দর্শন বাস্তবায়ন পরিষদ’ কর্তৃক ২০০০ সালে ‘বঙ্গবন্ধু পদক’ লাভ করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের পাঁচ দশকের দাপুটে এক রাজনীতিবিদ। বুক ভরা সাহস, মননে তেজ আর আত্মা ভরা ছিলো কমিটমেন্ট!মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ময়মনসিংহ অঞ্চলের রাজনীতির এক প্রাণপুরুষ ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকালিন ময়মনসিংহের অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নাম ছিলো মানুষের মুখে মুখে। ইতিহাসে তারা থাকবেন স্বর্ণাক্ষরে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের মেঘালয়ের তুরার ঢালুতে ইয়ুথ ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন এই টগবগে ছাত্রনেতা।
তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসে ঐতিহাসিক মিছিলে নেতৃত্ব দেন কিংবদন্তি এই নেতা। শহরের সার্কিট হাউজ মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ময়মনসিংহের আলমগীর মনসুর মিন্টু। তার স্মরণে ওই বছর প্রতিষ্ঠা করা হয় আলমগীর মনসুর মিন্টু মেমোরিয়াল কলেজ। মতিউর রহমান জামালপুরের নান্দিনা কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে এই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছর তিনি কলেজ থেকে কোনো ধরণে পারিশ্রমিক নেননি। উদ্দেশ্য ছিলো শহীদ মিন্টুর নামে কলেজটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ময়মনসিংহ পৌরসভার তিন বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মতিউর রহমানকে নিয়ে একটি দৈনিকে লিখেছিলেন, তার গায়ের রং তেমন উজ্জ্বল না হলেও মুক্তিযুদ্ধে মতিউরের বুকের রং ছিলো সমুজ্জ্বল।
স্বাধীনতার পরই দায়িত্ব পান ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের। এরপর দুই বার সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে টানা ১৮ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
২০০২ সালে ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে জঙ্গিরা বোমা হামলা করে। সেই ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করে নিমর্ম নির্যাতন করা হয়। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্যে গর্জে উঠেছিলেন এই পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। তিনি ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনকে ময়মনসিংহে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছিলেন।
শেখ হাসিনার মুক্তির ইস্যুতে ২০০৮ সালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি অনুষ্ঠানের প্রটোকল ভেঙে প্রথম দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার মুক্তি ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। একইসঙ্গে শেখ হাসিনার মুক্তির আন্দোলন ছাড়া এই সভায় কোনো আলোচনা হবে না। আঙুল তুলেছিলেন তখনকার সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের দিকে। অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের বক্তব্যের পরই ঘুরে যায় সভার পরিবেশ। শেখ হাসিনার মুক্তির গতি দ্রুত ত্বরান্বিত হতে থাকে ওই সভা থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান,পল্লী বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিরোধী দলীয় নেএী বেগম খালেদা জিয়া ও চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বার বার গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন বহু বছর। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দুই বার ২৩ মাস জেল খাটেন৷ দীর্ঘ সময়ে বুকের উত্তাপে আগলে রেখেছেন ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। ২০১৪ সালে দায়িত্ব পান ধর্ম মন্ত্রীর। তার মন্ত্রীত্ব লাভের মধ্যে দিয়ে ময়মনসিংহবাসী প্রথম পুর্ণ মন্ত্রীত্বের স্বাদ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন।
৮১ বছর বয়সে নিভে গেলো লড়াকু ও পোড় খাওয়া বর্ণিল রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের জীবন প্রদীপ।শেষ বিদায়ে উপস্থিত মহলের নিবেদন,হে অবিসংবাদিত নেতা,চিরকাল বেঁচে থাকবেন কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায়। বিদায় হে বীর,তবে তুমি চিরঞ্জীব।১৯৪২ থেকে ২০২৩ আপনার জীবন যাপন একটি ইতিহাস, আপনি একটি প্রতিষ্ঠান।
অগনিত মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হলেন কিংবদন্তি বর্ষিয়ান রাজনীতিক একুশে পদকপ্রাপ্ত সিংহপূরুষ খ্যাত সর্বজন শ্রদ্ধেয় বীর
মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।
ময়মনসিংহ আঞ্জুমান কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যারের জানাযা নামাজে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে।ঐহিহাসিক ঈদগামাঠে নামাজে জানাজায় আগত মানুষের ঠাঁই না হওয়ায় রাস্তায় ও চারদিকে যে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে নামাজে জানাজায় অংশ গ্রহণ করেন। যা ইতোপূর্বে ময়মনসিংহে কারও জানাজায় পরিলক্ষিত হয়নি।
পিতৃহারা হয়ে অজরে কাঁদলেন মরহুমের একমাত্র ছেলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহিত উর রহমান শান্ত।তিনি বলেন,আমার বাবা সারাটি জীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করে গেছেন। তিনি কষ্ট ভোগ করেও সততার সাথে জীবন ধারণ করেছেন। কোন লোভ লালসা তাকে ছুতে পারেনি। তারপরও বাবা রাজনীতি করতে গিয়ে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে, অথবা আমরা তার সন্তান বা তার ভাইদের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন। বাবার কাছে কারও কোন দেনা পাওনা থাকলে আমার কাছে বলবেন আমি পরিশোধ করে দিবো বলে অঝোরে কাঁদলেন মোহিত উর রহমান শান্ত।
কাদালেন লাখো নেতাকর্মী ও মুসল্লীদের।আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও মরহুম এর অনুসারী এবং ভক্তবৃন্দও চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। তারাও হাউ মাউ করে কাঁদলেন স্বজন হারানোর কষ্টে।উল্লেখ্য যে আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের জানাজায় মানুষের উপস্থিতি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ইতোপূর্বে ময়মনসিংহে কারো জানাজায় এতো মানুষ হয়নি।







