দেশের পুরাতন ৩১৭ টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকগণ তাদের প্রবেশপদ নবম গ্রেডে উন্নীত করা এবং সরকারি কলেজের ন্যায় একটি যৌক্তিক একাডেমিক পদসোপান দীর্ঘ দিন ধরে দাবী করে আসছেন। এই দাবীর স্বপক্ষে তাঁদের নেতৃত্ব পর্যায়ের শিক্ষকগণ বেশ কিছু যুক্তি এবং তথ্য তুলে ধরে বারবার সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে তাদের এ দাবি বাস্তবায়নে নিয়ম তান্ত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন কিন্তু সুদীর্ঘকাল ব্যাপী তাদের সে দাবি আজও আলোর মুখ দেখেনি!
কিন্তু কেন?
আপনারা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশের প্রথম পে-স্কেল গঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। সেই পে-স্কেলে সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক/পিটিআই ইন্সট্রাকটর (তখন পিটিআই ইন্সট্রাকটর ও সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক এই দুটি একই পদমর্যাদার ছিল এবং অভিন্ন নিয়োগে নিয়োগ পেত) পদটি তৎকালীন সময়ে ছিল ষষ্ঠ গ্রেডভুক্ত পদ। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের পে-স্কেলে গ্রেড সংখ্যা ছিল ১০ টি।
সেই পে-স্কেলে সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের সমগ্রেডভুক্ত আরো ছিল থানা শিক্ষা অফিসার, থানা সমাজসেবা অফিসার এবং সাব রেজিস্টার পদসমূহ।
আপনারা জেনে আরো অবাক হবেন যে, ১৯৭৭ সালে গঠিত পে-স্কেলে সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক/পিটিআই ইন্সট্রাকটর পদটি ১০ম গ্রেডভুক্ত করা হয় এবং পূর্বের সমগ্রেড ভুক্ত অন্যান্য পদসমূহ যেমন- থানা শিক্ষা অফিসার, থানা সমাজসেবা অফিসার এবং সাব রেজিস্টার পদকে একধাপ নিচে নামিয়ে ১১ তম গ্রেডভুক্ত করা হয়।
আবার,
১৯৮৫ সালের পে-স্কেলে সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক/পিটিআই ইন্সট্রাকটর পদটি যথারীতি ১০ম গ্রেডের ই থাকে এবং পূর্বের ১১তম গ্রেডের সাব-রেজিস্টার পদটিকে সহকারী শিক্ষক/পিটিআই ইন্সট্রাকটর পদের সমমান (১০ম গ্রেডভুক্ত) করা হয়। এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদটি যথারীতি ১১তম গ্রেডে ই থাকে। *কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার পদটিকে ১১তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়।
বড়ই আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালে গঠিত পে-স্কেলে। *এখানে এসে সহকারী শিক্ষক পদটি ১০ম গ্রেডে ই বহাল থাকে কিন্তু পিটিআই ইন্সট্রাকটর পদটি (যা সহকারী শিক্ষকদের সমগ্ৰেডের এবং পারস্পরিক বদলিযোগ্য পদ ছিল এবং একই সাথে অভিন্ন নিয়োগে নিয়োগ পেত) প্রজ্ঞাপন নং- প্রশ- ১/১৫(২)/৪১৯৪/২৪ বলে ০৬/০১/১৯৯৬ ইং তারিখে ৯ম গ্রেডভুক্ত প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদে উন্নীত করা হয় এবং পূর্বের ১১ তম গ্রেডের উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদটিকে একধাপ উপরে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয় এবং একই পে-স্কেল বর্ষে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদটিকে ১৯/১২/১৯৯৪ ইংরেজি তারিখে আরেকধাপ উপরে নবম গ্রেডে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদে উন্নীত করা হয় যার প্রজ্ঞাপন নং-১৪০১। সাবরেজিস্টার পদটিকে ১০ম গ্রেড থেকে ০৫/০১/১৯৯৪ ইং তারিখে ১৪০০ নং প্রজ্ঞাপন বলে ৯ম গ্রেডের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদে উন্নীত করা হয় এবং উপজেলা সমাজসেবা অফিসার পদটি ২০/১২/১৯৯২ ইং তারিখে প্রজ্ঞাপন নং-খ (খ) ১ ই ২৬/৯২ (অংশ) এর মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দেওয়া হয়।
১৯৯৭ সালে গঠিত পে-স্কেলে সহকারী শিক্ষক পদটি যথারীতি পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ১০ম গ্রেডে বহাল থাকে এবং উল্লিখিত অন্যান্য পদসমূহ পূর্বের ন্যায় নবম গ্রেডে ই বহাল থাকে।
একই ভাবে ২০০৫ সালে গঠিত পে-স্কেলে সহকারী শিক্ষক পদটি যথারীতি ১০ম গ্রেডে ই বহাল থাকে এবং উপরে উল্লিখিত পদসমূহও নবম গ্রেডে ই বহাল থাকে।
২০০৯ সালে গঠিত পে-স্কেলে সহকারী শিক্ষক পদটি যথারীতি ১০ম গ্রেডে র ই থাকে এবং ১৫/০৫/২০১২ ইং তারিখে প্রজ্ঞাপন নং- ৩৭.০০.০০০০.০৭১.০৪.০০৪.০৩ (অংশ)-৫৩০ দ্বারা সহকারী শিক্ষক পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দেওয়া হয়।
*২০১৫ সালে গঠিত পে-স্কেলেও সহকারী শিক্ষক পদটি ১০ম গ্রেডে ই বহাল থাকে!
উপর্যুক্ত তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদটির সমমান গ্রেডের অথবা একই পদ অথবা নিচের গ্রেডভুক্ত পদসমূহ ও বর্তমানে নবম গ্রেডভুক্ত কিন্তু সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদটি আজও দশম গ্রেডে ই রয়ে গেছে!
সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদটি নবম গ্রেডভুক্ত না করার কোনো যৌক্তিকতা আমরা আজও খুঁজে বের করতে পারিনি, সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের প্রবেশপদ টি ন্যায্যতার ভিত্তিতে অবশ্যই নবম গ্ৰেডভূক্ত করা সমীচীন। এখানে উল্লেখ্য যে, নবম গ্রেডের অন্যান্য পদে প্রবেশের যে সকল যোগ্যতা প্রয়োজন সেই সকল যোগ্যতা ই সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের তো রয়েছে ই বরং এখানে কর্মরত শিক্ষকদের অধিকতর যোগ্যতা হিসেবে শিক্ষায় বিএড ডিগ্রি রয়েছে।
পরিশেষে,
আমি ও আমরা দৃঢ় ভাবে আশাবাদী যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মূহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়ন তথা জীবনমানের উন্নয়নে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিশ্চয়ই উপরিল্লিখিত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সমূহে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবী (যা’ সাংবিধানিকভাবে সমতা ও ন্যায্যতার ধারা মোতাবেক আমাদের অধিকারে রূপান্তরিত হয়েছে) সহকারী শিক্ষকদের প্রবেশ পদটিকে নবম গ্রেডে উন্নীত করার “নির্বাহী আদেশ” প্রদানের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষকদের কাছে আজীবন শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হবেন এবং আমাদের জন্য এটি তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত এ নতুন বাংলাদেশের “শ্রেষ্ঠ উপহার” হিসেবে পরিগণিত হবে।
সরকারি মাধ্যমিকের দীর্ঘদিনের বঞ্চিত শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রাপ্তির দৃঢ় প্রত্যাশী-
মোঃ ওমর ফারুক
সহকারী শিক্ষক (বাংলা)
সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়,খুলনা।
ও
সমন্বয়ক
কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস)








