রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আজ রোববার বেলা ১১টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি সংস্কারবিরোধী নয়; বরং সংস্কারের পক্ষে একটি অঙ্গীকারবদ্ধ রাজনৈতিক দল। তিনি অভিযোগ করেন, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, “সংস্কারের প্রতি বিএনপির প্রতিশ্রুতি প্রশ্নাতীত। একটি মহল ও কিছু গণমাধ্যমের অংশ আমাদের সংস্কার উদ্যোগকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।”
সংস্কার নিয়ে বিএনপির অবস্থান
বিএনপি মহাসচিব জানান, দলটি দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে আসছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন:
-
২০১৬ সালের ‘ভিশন ২০৩০’
-
২০২০ ও ২০২২ সালে ঘোষিত ২৭ দফা রূপরেখা
-
পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি
এছাড়াও, বর্তমান সরকারের অধীনে গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনে বিএনপি গঠনমূলক মতামত দিয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিভিন্ন কমিশনে বিএনপির মতামতের পরিসংখ্যান
✅ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার:
-
৪৭টি সুপারিশের মধ্যে ৪৬টিতে বিএনপি একমত
-
১টিতে (২৯ নম্বর প্রস্তাব) ভিন্নমত: আদালতের অনুমতি সংরক্ষণে বিএনপির অনুরোধ
✅ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন:
-
মোট সুপারিশ: ২০৮টি
➤ ১৮৭টিতে একমত
➤ ৫টিতে আংশিক একমত
➤ ৫টিতে ভিন্নমত
➤ ১১টি প্রস্তাবে একমত নয়, যার মধ্যে প্রদেশ সৃষ্টি ও প্রশাসনিক পদোন্নতি বিষয়ে আপত্তি
✅ বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন:
-
মোট সুপারিশ: ৮৯টি
➤ ৬২টিতে একমত
➤ ৯টিতে আংশিক একমত
➤ ১৮টিতে যুক্তিসমেত ভিন্নমত
➤ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক সব প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন
✅ সংবিধান সংস্কার কমিশন:
-
মোট সুপারিশ: ১৩১টি
➤ অধিকাংশ সুপারিশে একমত
➤ ৭০ অনুচ্ছেদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণে আপসমূলক সমর্থন
➤ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা (আর্টিকেল ৪৯) সংশোধনে সম্মতি
✅ নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন:
-
মোট সুপারিশ: ২৪৩টি
➤ ১৪১টিতে একমত
➤ ১৪টিতে আংশিক একমত
➤ ৬৪টিতে ভিন্নমতসহ একমত
➤ ২৪টিতে একমত নয়, যেমন কিছু প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব করতে পারে
✅ পুলিশ সংস্কার কমিশন:
-
এখনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি
➤ প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, র্যাব বিলুপ্তিসহ অধিকাংশ প্রস্তাবে ঐকমত্য
বিচারপতি নিয়োগ ও সংসদীয় সংস্কার
মির্জা ফখরুল জানান, প্রধান বিচারপতির নিয়োগ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধীদলকে সভাপতির পদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। সংসদে আসন সংখ্যার ভিত্তিতে কমিটির নেতৃত্ব বণ্টনের প্রস্তাবেও দলটি একমত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য প্রসঙ্গে
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, ন্যায়পাল আইন যুগোপযোগীকরণ ও নির্বাচনী এলাকার সীমানাবিন্যাস সংস্কারে আমরা একমত হয়েছি।” তিনি আরও বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে যেমন আগ্রহ রয়েছে, তেমনি কিছু হতাশা ও উৎকণ্ঠাও রয়েছে।
গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান
এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “নির্বাচন বিলম্বে যারা ভূমিকা রাখছে, তারা গণতন্ত্রের পক্ষে নয়।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি বিপ্লব নয়, বরং নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়।
শেষ কথা
মির্জা ফখরুল বলেন, “জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো প্রয়াসই প্রকৃত সংস্কার নয়।” তার মতে, গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল না করেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।








