‘আমরা নীরব ছিলাম, ভয় আমাদের স্তব্ধ করে রেখেছিল’

পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা: নীরব দর্শকদের আত্মগ্লানি, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

ঢাকা, শনিবার:
পুরান ঢাকার এক ব্যস্ত বিকেলে, শত শত মানুষের সামনে বর্বরভাবে হত্যা করা হলো ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের কাছে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে গত বুধবার (৯ জুলাই)। সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি, চাঁদা না দেওয়ার ‘অপরাধে’।

সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী পুরান ঢাকার এক রাসায়নিক ব্যবসায়ী জানান,

“আমি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। শত শত মানুষ ছিল, সবাই তাঁর চিৎকার শুনেছিল। কিন্তু কেউই কিছু করেনি। কেউ ভিডিও করছিল, কেউ তাকিয়ে দেখছিল। আমরা সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই ভয়ই আমাদের মুখ বন্ধ করে দেয়, পা আটকে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “এখন ভাবলে খুব কষ্ট হয়, আমরা যদি একসাথে প্রতিবাদ করতাম, সোহাগ হয়তো বেঁচে যেতেন। এই ঘটনা আমার জীবনে দুঃসহ স্মৃতি হয়ে থাকবে।”

‘চাঁদা না দিলে প্রাণ যাবে’ — সোহাগের শেষ দিন

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে প্রায় ২০–২২ জন যুবক ও তরুণ এসে সোহাগকে তাঁর দোকান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। দোকানদাররা বাধা দিতে চাইলে সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে বলে,

“চুপ করে দোকানে বসে থাক, নইলে খবর আছে।”

এরপর শুরু হয় চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি। তাঁকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে। কিছুক্ষণ পর খবর আসে—সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ইট-পাথর ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে চাঁদার চাপ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তামা-কাঁসার ব্যবসায়ী জানান, সোহাগ গত চার মাস ধরে মাহমুদুল হাসান (মহিন), ‘ছোট’ মনির, আলমগীরসহ কয়েকজন সন্ত্রাসীর চাঁদার চাপে ছিলেন। প্রথমে প্রতি মাসে তিন লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে এক বিএনপি নেতার মধ্যস্থতায় তা কমে দুই লাখে আসে। তবে গত বুধবার চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁকে হত্যা করা হয়।

একসময় ছিলেন যুবদলের সঙ্গে যুক্ত

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত সোহাগ একসময় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ঘটনায় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন কর্মীর সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।

স্তব্ধ পরিবার, তালাবদ্ধ বাসা

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের একটি বহুতল ভবনের নবম তলায় স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ বসবাস করতেন সোহাগ। শনিবার সকাল ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে।

অষ্টম তলার প্রতিবেশী মো. আলী নুর জানান,

“সোহাগ ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। উৎসবে সবার বাসায় খাবার পাঠাতেন। শেষবার গত সোমবার সকালে দোকানে যাওয়ার পথে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন।”

সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের মানববন্ধন

এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ শনিবার সকাল ১১টায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের সড়কে প্রতিবাদ সভা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক সিগবাতুল্লাহ, প্রকাশনা সম্পাদক আজিজুর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রিয়াজুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা।
তারা বলেন,

“দেশজুড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা—এসব বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা থাকবে না। আমরা চাই, সোহাগ হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হোক।”

প্রত্যাশা: ন্যায়বিচার ও কঠোর শাস্তি

সোহাগ হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি নগরের নাগরিক জীবনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা আজ নিজেদের আত্মগ্লানিতে ভোগেন।
তাদের একটাই দাবি—

“এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। দোষীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হোক।”

সংগৃহীত সূত্র: প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পুলিশ

অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ঘটনায় দু’ভাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত

ফয়সাল আজম অপু, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় মিলন (৬০) ও আলম (৪৫) নামে দু’ভাই নিহত হয়েছেন। বুধবার রাত দশ টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাচোল থানা…

শ্বশুর কর্তৃক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু; স্বামী গ্রেফতার

রউফুল আলম, ব্যুরো চীফ, রংপুর: রংপুর মহানগরীর কোতয়ালী থানাধীন এলাকায় এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটেছে। নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে, মৃতার শ্বশুরের দ্বারা তাকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। মৃতার স্বামী…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *